যারা নিজেদেরকে ইসলামি দল ঘোষণা করছে,তাদের দলীল মনোগ্রাম থেকে ‘আকিমুদ্দীন’ বাদ দেওয়া হয়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
যারা নিজেদেরকে ইসলামি দল ঘোষণা করছে,তাদের দলীল মনোগ্রাম থেকে ‘আকিমুদ্দীন’ বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলূম বাবুনগর মাদ্রাসার ১০৪তম বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং মহাসম্মেলনে যোগ দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যরা ফটিকছড়িতে আসেন। তাদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে।
বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং দেশের ক্রান্তিকালে হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও দ্বীন, দেশ ও ইসলামবিদ্বেষী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিল। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর লেগেছে। আর ফ্যাসিবাদী ও আলেম-ওলামাবিরোধী সরকারের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করতে ১৬-১৭ বছর লেগেছে।শাপলা চত্ত্বরে অনেক আলেম-ওলামা রক্ত দিয়েছেন। তাদের অনেকের নাম ও কবরের ঠিকানাও এখনো জানা যায়নি।
বহু আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশ ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত ১৬-১৭ বছরে প্রায় তিন হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনি নিজেও ছিলেন বলে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া প্রায় সাত হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ হামলা-মামলার মাধ্যমে নিপীড়িত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমরা কি আবার সেই ফ্যাসিবাদীদের পুনরাগমন চাই? প্রত্যাবর্তন চাই? তাহলে সেই ক্ষেত্র আজকে কারা তৈরি করে দিচ্ছে?’
গার্মেন্টস খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা এ ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত রয়েছে। এ দেশে এমন কিছু দুষ্কৃতকারী রয়েছে, যারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করছে। অথচ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইসলামের বিষয়টি নেই বললেই চলে।
যারা নিজেদেরকে ইসলামি দল ঘোষণা করছে,তাদের দলীল মনোগ্রাম থেকে ‘আকিমুদ্দীন’ বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তারা মুখে এক কথা বলে, কিন্তু তাদের দলিলে কী প্রমাণ আছে, সেটি বলে না। তারা কখনো তাদের ইশতেহারে বলেনি, তারা ইসলামী শাসন চায়। শরিয়াভিত্তিক আইন-কানুন চালু করতে চায়। বরং তারা শরিয়াভিত্তিক শাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’
নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চান তারা।
জুলাই জাতীয় সনদ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়ন করবে। পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধের বিষয়গুলোও সংবিধানে ধারণ করা হবে।
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। সরকারকে সহযোগিতা করা যেতে পারে, তবে দেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো সহযোগিতা করা উচিত নয়।
দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কাজ করতে চায়। পাশাপাশি আলেম-ওলামা ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পরে তিনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামারা বয়ান পেশ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মুফতি রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী, মাওলানা মুফতি মুস্তাকুন্নবী কাসেমী, মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী, মুফতি মাহমুদুল হাসান ভূজপুরী, মুফতি হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মুফতি সাখাওয়াত হোসেন রাজি, মুফতি রেজাউল করিম আবরার, মাওলানা গাজী ইয়াকুব ওসমানী ও মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মারুফসহ অনেকে।
দুই দিনব্যাপী এ মহাসম্মেলন ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। শুক্রবার রাতে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় সম্মেলনের সমাপ্তি হয়।