নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটাতে পারে মঙ্গলবারের নির্বাচন
ইসরায়েলে আগামীকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশটির ২৬তম জাতীয় নির্বাচন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই প্রথম নির্বাচন। এই ভোটের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং বিরোধী শিবিরের অন্য নেতারা।
২০ অক্টোবর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্সের জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬২টি আসন পেতে পারে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। তবে নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী লিকুদ পার্টির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। তাঁর নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টি ভোটারদের সামনে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে। সামরিক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তাবিষয়ক অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন আইজেনকট। গাজা যুদ্ধে নিজের ছেলেকে হারানোর ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ ‘টুগেদার’ নামে জোটবদ্ধ হয়েছেন। অতীতেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে ভূমিকা রেখেছিলেন তাঁরা। এবারও সরকার পরিবর্তনের মতো সংসদীয় সমর্থন অর্জন তাঁদের লক্ষ্য।
নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরে আরও রয়েছেন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান ও সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলান। তবে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকায় নির্বাচনের পর সরকার গঠনে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
নির্বাচনে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের মতো দলগুলো কোনো পক্ষ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি। হামাসের নেতৃত্বে ওই হামলায় ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতা সামনে আসে। এরপর গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান, লেবাননে সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশটির রাজনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
জেরুজালেমভিত্তিক ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন, ৭ অক্টোবরের হামলা ও পরবর্তী পরিস্থিতি তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। আরব ইসরায়েলিদের মধ্যে ৩২ শতাংশ বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁদের কাছে নিজ নিজ এলাকার অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় ইস্যু।
নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁকে নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ে অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর সরকারের ভূমিকা এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে বিচার চলছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। গাজা যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের নীতি এবং লেবানন, সিরিয়া ও ইরানকে ঘিরে সামরিক কৌশল আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। নতুন সরকার গঠিত হলে এসব নীতিতে ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ রয়েছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। কোনো একক দল সাধারণত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। তাই বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠিত হয়। সংসদে আসন পেতে একটি দলকে বৈধ ভোটের কমপক্ষে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়।
ইসরায়েলিরা সরাসরি কোনো প্রার্থীকে নয়, দলীয় তালিকায় ভোট দেন। নির্বাচনের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আদায়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন। ফলে কোনো দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না। শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিশ্চিত করতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করবে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন।