শ্রেণিকক্ষ থেকে জাতি গড়ার কারিগর, আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস
‘আজ হতে চিরউন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির’—কাজী কাদের নেওয়াজের কালজয়ী কবিতার এই পঙ্ক্তি মনে করিয়ে দেয় শিক্ষকের মর্যাদার কথা। একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ পড়ান না; জ্ঞান, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলেন একটি প্রজন্ম। তাঁদের অবদানকে সম্মান জানাতেই আজ ৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং শিক্ষকতা পেশার গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
একটি স্বপ্নের পেছনে থাকেন একজন শিক্ষক
সকাল হলেই শ্রেণিকক্ষের দরজা খুলে যায়। হাতে বই নিয়ে সামনে দাঁড়ান শিক্ষক। একঝাঁক কৌতূহলী চোখ তখন তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকে। সেই চোখগুলোর কোনোটি স্বপ্ন দেখে চিকিৎসক হওয়ার, কোনোটি প্রকৌশলী, কেউ হতে চায় বিজ্ঞানী, আবার কেউ স্বপ্ন দেখে একদিন শিক্ষক হওয়ার।
শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্নকে বাস্তবের পথে এগিয়ে নিতে দিনের পর দিন কাজ করে যান একজন শিক্ষক। তাঁর নিজের জীবনের গল্প হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, সাফল্যের মঞ্চেও তাঁকে দেখা যায় না। কিন্তু তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাই একদিন সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হয়।
একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে তাই শুধু তার নিজের মেধা ও পরিশ্রম থাকে না; থাকে বহু বছরের শিক্ষকের পরামর্শ, শাসন, উৎসাহ ও নিরলস শ্রম।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষকের পাঠ
শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করা নয়। একটি শিশুকে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেওয়া এবং ব্যর্থতার পর আবার ঘুরে দাঁড়াতে শেখানোও শিক্ষকের দায়িত্বের অংশ।
কখনো একটি উৎসাহের বাক্য, কখনো একটি সঠিক পরামর্শ—শিক্ষকের এমন ছোট্ট উদ্যোগই বদলে দিতে পারে একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন।
আজকের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, সাহিত্যিক, সাংবাদিক কিংবা রাজনীতিবিদ—প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান রয়েছে। কেউ স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, কেউ ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করেছেন, আবার কেউ কঠিন সময়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছেন।
তাই শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের একজন পাঠদানকারী নন; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতা।
সাফল্যের আলোয় শিক্ষার্থী, আড়ালে শিক্ষক
কোনো শিক্ষার্থী বড় সাফল্য অর্জন করলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হন সেই শিক্ষার্থীই। সংবাদপত্রে তাঁর ছবি ছাপা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে বছরের পর বছর শ্রম দেওয়া শিক্ষকটির নাম অনেক সময়ই থেকে যায় আড়ালে।
বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক শিক্ষক নিয়মিত দায়িত্বের বাইরেও অতিরিক্ত সময় দেন। কখনো তাঁরা হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীর অভিভাবক, কখনো পরামর্শদাতা, আবার কখনো কঠিন সময়ে আশ্রয়ের জায়গা।
একজন শিক্ষার্থীর খাতা দেখার সময় থেকে শুরু করে তার আচরণ, মানসিকতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা—শিক্ষকের দায়িত্বের পরিধি অনেক বড়। এই নীরব শ্রমের হিসাব সব সময় করা যায় না।
বদলে গেছে শ্রেণিকক্ষ, বেড়েছে চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। একই সঙ্গে শিক্ষকদের সামনে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জও।
একসময় শিক্ষার্থীর জ্ঞানের প্রধান উৎস ছিল পাঠ্যবই ও শিক্ষক। এখন তার হাতে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও অসংখ্য অনলাইন উৎস। ফলে তথ্য পাওয়া সহজ হলেও সঠিক তথ্য বেছে নেওয়া হয়ে উঠেছে কঠিন।
এই বাস্তবতায় শিক্ষককে এখন শুধু তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব পালন করলেই হচ্ছে না। তাঁকে হতে হচ্ছে তথ্য যাচাইয়ের পথপ্রদর্শক, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পরামর্শদাতা এবং মূল্যবোধের শিক্ষক।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সময়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতা ধরে রাখাও শিক্ষকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রান্তিক শিক্ষকের নীরব লড়াই
শহরের আধুনিক শ্রেণিকক্ষের বাইরেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন অসংখ্য শিক্ষক।
কখনো শিক্ষা উপকরণের সংকট, কখনো যাতায়াতের দুর্ভোগ, আবার কখনো নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
অনেক শিক্ষক নিজের সময় ও শ্রমের বড় একটি অংশ ব্যয় করেন পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য। তাঁদের এই নীরব অবদান পরিসংখ্যানের পাতায় সব সময় উঠে আসে না। অথচ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
মর্যাদার পাশাপাশি অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, মানুষ গড়ার দায়িত্বও। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নানা সামাজিক কারণে শিক্ষকতা পেশা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে শিক্ষকরা অনেক সময় অপমান-অপদস্থ হওয়ার অভিযোগও করেন। একই সঙ্গে বেতন, ভাতা, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রত্যাশা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে আলাদা বেতন কাঠামো তৈরির বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাঁর মতে, শুধু একটি দিনকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করলেই শিক্ষকদের কল্যাণ নিশ্চিত হবে না; তাঁদের পুরো জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রামের একটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মামুনুর রশীদ বলেন, শুধু মূল বেতন বাড়ালেই হবে না, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। মূল্যস্ফীতির কারণে বাসাভাড়া, চিকিৎসা এবং সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বেড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাতা না হলে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার সংকট থেকেই যাবে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা জোটের নেতা ও সাবেক অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণই শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। তাঁর মতে, বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে হলেও এতে আপত্তি নেই; ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথম ধাপে এবং পর্যায়ক্রমে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণের আওতায় আনা যেতে পারে।
‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ আজও প্রাসঙ্গিক
কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতায় বাদশাহ আলমগীর ও তাঁর পুত্রের শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা আজও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কবিতার কাহিনিতে বাদশাহ আলমগীর দেখেন, তাঁর পুত্র শিক্ষকের পা ধোয়ার সময় নিজ হাতে পানি ঢালছে না; বরং শিক্ষককে এক হাতে পানি ঢালতে হচ্ছে। এতে বাদশাহ মর্মাহত হন। তাঁর মতে, রাজপুত্রের উচিত ছিল নিজ হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে দেওয়া।
কবিতার এই বার্তা স্পষ্ট—ক্ষমতা কিংবা রাজসিংহাসনের চেয়েও শিক্ষকের মর্যাদা বড়। কারণ একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।
শুধু শুভেচ্ছা নয়, প্রয়োজন মর্যাদা
বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই কেবল শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোর একটি দিন নয়। এটি শিক্ষকদের অবদানকে নতুন করে স্মরণ করার, তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে ভাবার এবং শিক্ষকতা পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনারও দিন।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে তার শিক্ষকসমাজ কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন তার ওপর।
শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্পে হয়তো শিক্ষকের নাম সবসময় সামনে থাকে না। কিন্তু প্রতিটি সাফল্যের পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণিকক্ষ, কোনো একজন শিক্ষক এবং তাঁর দেওয়া একটি শিক্ষা নীরবে কাজ করে যায়।
সেই নেপথ্যের কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন আজ—বিশ্ব শিক্ষক দিবস।