| | |

অর্থনীতি

ফটিকছড়িতে রোকন-মামুনের বিদেশি ফল সাম্মামের চাষ, কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা

মরুভূমির ফল হিসেবে পরিচিত সাম্মাম। গরম আর শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে যার নামটা যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই মরুর ফলই এবার ফলন দিচ্ছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাটিতে। প্রচলিত ফসলের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি এই ফলের চাষ করে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন উপজেলার দুই উদ্যোক্তা—রোকন উদ্দিন কাসেমি ও মামুন।

প্রথমবারের মতো প্রায় তিন হেক্টর জমিতে সাম্মাম চাষে নেমেছিলেন তারা। নতুন ফসল, নতুন চাষপদ্ধতি—সব মিলিয়ে শুরুতে ছিল নানা সংশয়। ফলন কেমন হবে, খরচ উঠবে কি না, বাজারে ক্রেতা মিলবে কি না—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল তাদের মনে। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই মাঠে নামেন তারা। আর প্রথম চেষ্টাতেই ভালো ফলন পাওয়ায় এখন সেই সংশয়ের জায়গা দখল করেছে আশাবাদ।

নতুন ফসলের নতুন যাত্রা
সরেজমিনে সাম্মামের ক্ষেত ঘুরে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রচলিত কৃষিপণ্যের বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু করার চিন্তা থেকেই সাম্মাম চাষের উদ্যোগ নেন তারা। স্থানীয় মাটিতে বিদেশি এই ফল কতটা মানিয়ে নেয়, তা নিয়েও ছিল কৌতূহল।

প্রথমবার হিসেবে তিন হেক্টর জমিতে সাম্মাম চাষ করেন রোকন উদ্দিন কাসেমি ও মামুন। চাষের বিভিন্ন ধাপে তারা কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়েছেন। নতুন ফসল হওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপেই ছিল শেখার সুযোগ।

উদ্যোক্তাদের হিসাবে, প্রতি কানি জমিতে সাম্মাম চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে প্রতি কানি জমির উৎপাদিত প্রায় ৬০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন তারা। জমিতে এখনো বিক্রির উপযোগী সাম্মাম রয়েছে। ফলে চাষের পুরো মৌসুম শেষে লাভের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

ক্ষেত থেকে বাজারে বাড়ছে আগ্রহ
শুধু মাঠে ফলন ভালো হলেই তো সাফল্য আসে না; নতুন ফসলের জন্য তৈরি করতে হয় বাজারও। ফটিকছড়ির সাম্মাম চাষিদের ক্ষেত্রেও সেই চ্যালেঞ্জ ছিল।

তবে বাজারে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, নতুন এই ফল নিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। উপজেলার নাজিরহাট বাজারে প্রতি কেজি সাম্মাম বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে।

স্থানীয় বিক্রেতা হারেছ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সাম্মামের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নতুন এই ফলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এতে বাজারে সাম্মাম বিক্রির সম্ভাবনাও বাড়ছে।

ক্রেতা বায়েজিদ হাসান মুরাদের কাছেও ফলটি পেয়েছে প্রশংসা। তিনি বলেন, সাম্মাম বেশ সুস্বাদু ও মজাদার। দেশীয় পুঠি বা বাঙ্কি ফলের মতোই এর স্বাদ তার কাছে ভালো লেগেছে।

মরুর ফল, স্থানীয় মাটিতে সম্ভাবনা
সাম্মাম মূলত তরমুজজাতীয় মিষ্টি ফল। এটি রকমেলন বা সুইটমেলন নামেও পরিচিত। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর চাষ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নতুন ফসল হিসেবে অনেক কৃষকই সাম্মাম চাষ করে বাজারজাত করছেন।

তবে ফটিকছড়ির মাটিতে প্রথমবারের মতো এই ফলের চাষ স্থানীয় কৃষিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। প্রচলিত ধান, সবজি কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের নতুন ফল চাষের সম্ভাবনাও যে রয়েছে, সাম্মামের ফলন সেই বার্তাই দিচ্ছে।

ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, সাম্মাম চাষের পদ্ধতি, উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনায় ফটিকছড়ির পরিবেশে এই ফলের চাষ আশাব্যঞ্জক।

কৃষি বিভাগের পরামর্শে নতুন ফসলের চাষে এগিয়ে আসা রোকন উদ্দিন কাসেমি ও মামুনের উদ্যোগ স্থানীয় অন্য কৃষকদেরও উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন ফসলের চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।

দুই উদ্যোক্তার হাত ধরে নতুন স্বপ্ন
একটি নতুন ফলের চাষ দিয়ে শুরু হলেও এর সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা আরও বড় পরিসরে। তাদের আশা, স্থানীয়ভাবে সাম্মাম চাষ ছড়িয়ে পড়লে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ফটিকছড়ির কৃষিতে বৈচিত্র্যও আসবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন ফল চাষের এই উদ্যোগ কেবল দুই উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। বরং এটি স্থানীয় কৃষিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত।

মরুভূমির আবহে জন্ম নেওয়া একটি ফল যখন ফটিকছড়ির মাটিতে ফলন দেয়, তখন সেটি শুধু একটি নতুন কৃষিপণ্যের গল্প থাকে না। হয়ে ওঠে নতুন করে স্বপ্ন দেখার গল্প—যেখানে পরিচিত ফসলের পাশাপাশি অপরিচিত একটি ফলও কৃষকের মাঠে এনে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন হিসাব।

ক্যাটাগরি