চট্টগ্রামকে দেশের প্রধান পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাই: মেয়র শাহাদাত
পাহাড়, সমুদ্র, নদী ও উপত্যকার অনন্য প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামকে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন হাব ও ইকো-ফ্রেন্ডলি পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে চট্টগ্রামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে এখনো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নগরীর হোটেল পেনিনসুলার ডালিয়া হলে দি বাংলাদেশ মনিটর আয়োজিত ১৭তম আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দি বাংলাদেশ মনিটরের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের পরিচয় শুধু বন্দরনগরী বা বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে নয়, পর্যটনের শহর হিসেবেও এর বড় সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র, নদী ও উপত্যকা। প্রকৃতি যেন চট্টগ্রামকে পর্যটনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও পর্যটন অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য বিমান যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
মেয়র বলেন, ‘কানেক্টিং ডেস্টিনেশন, ক্রিয়েটিং অপরচুনিটি’ প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। একটি পর্যটন গন্তব্যকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য। তাই চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও সীতাকুণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন রুট তৈরি করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হবে।
নগরীর সৌন্দর্য ও পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে মেয়র বলেন, বিমানবন্দর সড়কে সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন, বিভিন্ন এলাকায় ওয়াকওয়ে নির্মাণ, খালের পাড় উন্নয়ন এবং সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু যোগাযোগের জন্য নয়, পর্যটন ও বিনোদনেরও অংশ। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা চট্টগ্রামে এসে যাতে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগরীর অভিজ্ঞতা পান, সে লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নগরীর বিভিন্ন খালকে পর্যটন ও বিনোদনের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান মেয়র। তিনি বলেন, খালের পাড়ে ওয়াকওয়ে, সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে নগরবাসী ও পর্যটকদের জন্য নতুন বিনোদনকেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব। ইতোমধ্যে কয়েকটি খালের পাড়ে ওয়াকওয়ে ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামকে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্যুরিজম হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মেয়র বলেন, কর্ণফুলী নদীর ওপারে সম্ভাবনাময় এলাকায় পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ, সবুজায়ন ও পাখির অভয়ারণ্যসহ পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের পর্যটনের প্রবেশদ্বার হতে পারে। এখান থেকে কক্সবাজার, বান্দরবানসহ বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যে সহজে যাওয়া যায়। এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারলে চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
পর্যটন বিকাশে নগরীর সৌন্দর্য ও নাগরিকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন, নিরাপদ চলাচল, হাঁটার জায়গা ও বিনোদনকেন্দ্রকে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করতে হবে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে ছোট-বড় বিভিন্ন পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে ৪১টি সবুজ খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগও পর্যটনবান্ধব ও বাসযোগ্য নগরী গড়ার পরিকল্পনার অংশ। ইতোমধ্যে ১১টি মাঠ প্রস্তুতের পথে রয়েছে। জাম্বুরি মাঠ, ফেরোজ শাহ মাঠ, বহুরূপী মাঠ, মহসিন কলেজ মাঠ ও চট্টগ্রাম কলেজ মাঠসহ বিভিন্ন মাঠের উন্নয়নকাজ চলছে।
মেয়র বলেন, একটি পর্যটন নগরী শুধু সুন্দর ভবন দিয়ে তৈরি হয় না। সেখানে সবুজ মাঠ, পার্ক, হাঁটার জায়গা, বিনোদনকেন্দ্র এবং মানুষের স্বস্তির পরিবেশ থাকতে হয়। আমরা সেই চট্টগ্রামই গড়ে তুলতে চাই।
চট্টগ্রামে একটি আধুনিক ‘সিটি সেন্টার’ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান মেয়র। সেখানে উন্মুক্ত স্থান, ওয়াকওয়ে, লাইব্রেরি, কফিশপ ও শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। নগরবাসী ও পর্যটকদের জন্য এটিকে নতুন আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
মেয়র আরও বলেন, পর্যটনকে শুধু বিনোদনের খাত হিসেবে দেখলে হবে না। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় ব্যবসার প্রসার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।
তবে পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে নাগরিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেন মেয়র শাহাদাত। তিনি বলেন, শুধু সিটি কর্পোরেশন কাজ করলেই হবে না। প্রত্যেক নাগরিককে শহরটাকে ভালোবাসতে হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। এই শহর আমাদের পূর্বপুরুষদের, আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের। তাই চট্টগ্রামকে সুন্দর রাখা সবার দায়িত্ব।
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা বহুগুণে বাড়বে। সম্মিলিত উদ্যোগে চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের ইকো-ফ্রেন্ডলি পর্যটন নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
মেয়র বলেন, “আমি নয়, আমরা সবাই মিলে চট্টগ্রামকে পর্যটন নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। চট্টগ্রামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।”