| | |

চট্টগ্রাম

শেষ ছবিটাই হয়ে রইল বাবার সঙ্গে, আল আমিনের মৃত্যুতে নিঃস্ব পরিবার

‘কয়দিন আগে ছুটিতে আইছিল আলামিন। শুক্রবার জুমার পরে আমার সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম। আমি তো বুঝি নাই যে এইডাই আমার বাবার সঙ্গে আমার শেষ ছবি।’—ছেলেকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন পুলিশ কনস্টেবল আল আমিন সরদারের বাবা আব্দুল হক সরদার।

চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা মোড়ে দায়িত্ব পালনকালে বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে সোমবার (৫ অক্টোবর) ভোরে মারা গেছেন পুলিশ কনস্টেবল আল আমিন সরদার। ছিনতাইকারী সন্দেহে তিন যুবককে থামানোর চেষ্টা করতে গিয়ে একজনকে আটকাতে মোটরসাইকেল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির বাসের ধাক্কায় আহত হন তিনি।

রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে জমিয়াতুল ফালাহ জামে মসজিদের সামনে ইস্পাহানি চেকপোস্ট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় আল আমিনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে আইসিইউতে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত আল আমিন মাদারীপুর সদর উপজেলার উত্তর দুধখালী গ্রামের আব্দুল হক সরদারের ছেলে। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। ২০২২ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন তিনি। কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ অর্ডার ম্যানেজমেন্ট শাখায় এবং কোতোয়ালী থানায় সংযুক্ত ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে বিবাহিত আল আমিনের আড়াই মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

যেভাবে দুর্ঘটনা

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন আল আমিনসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করা তিন যুবককে দেখে তাঁদের থামার সংকেত দেন পুলিশ সদস্যরা। একপর্যায়ে একজন পালানোর চেষ্টা করলে চেকপোস্টের ইনচার্জ এএসআই হিরণ মিয়া তাকে ধাওয়া করেন।

একই সময়ে আল আমিন মোটরসাইকেল নিয়ে অন্য দিক থেকে ওই যুবককে আটকানোর চেষ্টা করেন। মসজিদের পশ্চিম ফটকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দ্রুতগতির বাস তাঁর মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেয়।

এতে মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন আল আমিন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর বাসটি তাঁকে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ গজ সড়কে টেনে নিয়ে যায়।

পরে সহকর্মীরা স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

গ্রেপ্তার দুই

দুর্ঘটনার ঘটনায় বাসচালক মোশাররফ (৩৮) ও স্টাফ জয় দাসকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটিও জব্দ করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

‘আমার ভাই পুলিশ হইছে, আমরা কত গর্ব করছি’

আল আমিনের বাবা আব্দুল হক সরদার বলেন, ‘কয়দিন আগে ছুটিতে আইছিল আলামিন। শুক্রবার জুমার পরে আমার সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম। আমি তো বুঝি নাই যে এইডাই আমার বাবার সঙ্গে আমার শেষ ছবি। আমার সাত সন্তানের মধ্যে আমার আলামিন ছিল সবচেয়ে নম্র-ভদ্র।’

একমাত্র ভাইকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বোন হালিমা। তিনি বলেন, ‘আমার একটা ভাই পুলিশ হইছে, আমরা যে কত গর্ব করছি। আল্লাহ যে আমার ভাইরে এত তাড়াতাড়ি নিয়্যা যাইব, আমরা তো তা জানতাম না।’

স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা আল আমিনের স্ত্রী ইশরাত জাহান রিয়া। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমি এখন কীভাবে বেঁচে থাকব? আমার আড়াই মাসের মেয়ে নিয়ে কার দুয়ারে যাব? আমার মেয়ে কাকে বাবা বলে ডাকবে? আল্লাহ, তুমি আমারে এত অল্প বয়সে কী করলা?’

ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মা সেলিনা বেগমের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। ছেলেকে হারিয়ে তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমার বাবায় পুলিশ অইছিল, আমার বাপ বুকটা ভইরা গেছিল। আমার হেই বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে রে! আমার বাবায় জানি কত কষ্ট পাইয়া মরছে।’

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির বলেন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আল আমিনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

সিএমপি জানিয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে আল আমিনের মৃত্যুতে পুলিশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।

সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হাবিবুর রহমান প্রামাণিক বলেন, দায়িত্ব পালনকালে ওই পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাঁর পরিবার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবে।

রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আল আমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়নি। সোমবার রাত ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।

ক্যাটাগরি