চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর
চট্টগ্রাম মহানগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে নগরের খালগুলোর দুই পাশে হাঁটার পথ, সাইকেল ট্র্যাক ও সবুজায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে নগরের টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সম্মেলনকক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে বিভিন্ন সরকারি সেবা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে অনেক সময় একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অন্য এলাকায় নতুন সমস্যা তৈরি হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
তিনি বলেন, বড় খালগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি দুই পাড়ে হাঁটার উপযোগী পথ এবং সম্ভব হলে সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের উন্নতির পাশাপাশি নগরবাসীর হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর সুযোগ বাড়বে। খালকেন্দ্রিক উন্নয়নকে শুধু পানি নিষ্কাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নগরের পরিবেশ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় প্রতি মাসে সমন্বয় সভা করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
১৩০ খালের উন্নয়নে নতুন পরিকল্পনা
সভাপতির বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরের নালা-খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। বর্ষার আগে নালা ও খালের উন্নয়ন এবং পরিষ্কার কার্যক্রমের জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ায় তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
মেয়র জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীতে মোট ১৩০টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে এবং আরও ৪১টি খালের উন্নয়নে প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। উন্নয়নকাজ শেষ হওয়া খালগুলো চসিকের কাছে হস্তান্তরের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিমানবন্দর এলাকায় ২ দশমিক ২ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ একটি সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে খালকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্পেও হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
খাল, ড্রেনেজ ও স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনায় জোর
চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার কিছু স্থানে ভারী বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এ সমস্যা সমাধানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল এবং পানি সংরক্ষণের স্থানগুলোকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানও জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন জানান, নগরের ১৩০টি খালের মধ্যে ৩৭টির সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি খালগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি স্লুইসগেট ও রেগুলেটরগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ এবং দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
আউটার রিং রোড প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, কালুরঘাট পর্যন্ত প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার আশা রয়েছে।
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া স্থায়ী সমাধান নয়
সভায় সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পটি শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের আওতার বাইরে থাকা খালগুলোও খনন এবং সংস্কার করা জরুরি।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, শুধু পাম্প ও স্লুইসগেট স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে আশ্রয় নেওয়ার মতো উঁচু জায়গার সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত এক কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলক উঁচু করে নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম স্লুইসগেট ও রেগুলেটর পরিচালনায় দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি নগরের দুই পাশে সংযোগকারী ক্রস খাল নির্মাণ, মহেশখাল সম্প্রসারণ এবং খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়—এমন সেতুর নকশা বিবেচনার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি জানান, হালিশহরে সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ আগামী বছর শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গৃহস্থালি বর্জ্যপানি সরাসরি ড্রেনে যাওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সভায় সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মনোয়ারা বেগম, জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়, চলমান প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং খাল-নালার দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা কমানোর পাশাপাশি নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানও উন্নত করা সম্ভব হবে।